২৩ ও ২৯ এপ্রিল ভোটের আগে নারী, যুব, কৃষক ও সরকারি কর্মীদের লক্ষ করে প্রতিশ্রুতির ঝাঁপি; অমিত শাহর দাবি, ‘বাংলার স্বপ্নপূরণের রূপরেখা’
কলকাতায় শুক্রবার পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা ভোটের জন্য বিজেপির সঙ্কল্পপত্র প্রকাশ করলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। দলীয় আনুষ্ঠানিক ঘোষণায় প্রকাশিত এই সঙ্কল্পপত্রে একদিকে যেমন মহিলাদের মাসে ৩ হাজার টাকা, বেকার যুবকদের আর্থিক সহায়তা, সরকারি চাকরিতে মহিলাদের জন্য ৩৩ শতাংশ সংরক্ষণ ও সরকারি বাসে বিনা ভাড়ায় যাতায়াতের প্রতিশ্রুতি রাখা হয়েছে, অন্যদিকে তেমনই ছ’মাসের মধ্যে সমান দেওয়ানি বিধি চালু, বাংলাদেশ সীমান্ত সিল করা এবং অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে ‘চিহ্নিত-ছাঁটাই-বহিষ্কার’ নীতির ঘোষণা করে স্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তাও দেওয়া হয়েছে। ভোট হবে ২৩ এপ্রিল ও ২৯ এপ্রিল, গণনা ৪ মে।
সঙ্কল্পপত্রের সবচেয়ে বড় নির্বাচনী অস্ত্র হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে নারী ভোটব্যাঙ্ককে। বিজেপি প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, সরকার গড়লে রাজ্যের মহিলাদের মাসে ৩ হাজার টাকা করে সহায়তা দেওয়া হবে। পাশাপাশি সরকারি চাকরিতে মহিলাদের জন্য ৩৩ শতাংশ সংরক্ষণ, সরকারি বাসে বিনামূল্যে যাতায়াত, মহিলা নিরাপত্তা জোরদারে আলাদা পদক্ষেপ এবং বিভিন্ন স্তরে নারী-সহায়তা অবকাঠামো গড়ার কথাও বলা হয়েছে। একাধিক নির্ভরযোগ্য প্রতিবেদনে এই প্রতিশ্রুতিগুলি একসুরে উঠে এসেছে।
যুবসমাজকেও সরাসরি টানার চেষ্টা করেছে গেরুয়া শিবির। সঙ্কল্পপত্রে বেকার যুবকদের মাসিক আর্থিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি রয়েছে। একই সঙ্গে ৫ বছরে ১ কোটি চাকরি ও স্বনিযুক্তির সুযোগ তৈরির লক্ষ্যও ঘোষণা করা হয়েছে। সরকারি কর্মচারী ও পেনশনভোগীদের জন্য কেন্দ্রীয় হারে মহার্ঘ ভাতা এবং ৪৫ দিনের মধ্যে সপ্তম বেতন কমিশন কার্যকরের আশ্বাসও দেওয়া হয়েছে, যা রাজ্যের চাকরিজীবী ও অবসরপ্রাপ্ত মহলে স্পষ্ট বার্তা বহন করছে।
রাজনৈতিক ও মতাদর্শগত দিক থেকে সঙ্কল্পপত্রের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ প্রতিশ্রুতি হল সমান দেওয়ানি বিধি। অমিত শাহ জানিয়েছেন, বিজেপি ক্ষমতায় এলে বাংলায় ছ’মাসের মধ্যে এই আইন কার্যকর করা হবে, যাতে প্রত্যেক নাগরিকের জন্য এক আইন থাকে। এর পাশাপাশি ধর্মাচরণের স্বাধীনতা সুনিশ্চিত করার কথাও বলা হয়েছে। নির্বাচনের মেরুকৃত আবহে এই প্রতিশ্রুতি যে বিজেপির কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক রেখাকেই বাংলায় আরও জোরালোভাবে হাজির করল, তা স্পষ্ট।
সীমান্ত ও অনুপ্রবেশের প্রশ্নেও কড়া অবস্থান নিয়েছে বিজেপি। সঙ্কল্পপত্রে বাংলাদেশ সীমান্ত সিল করার কথা বলা হয়েছে। অবৈধ অনুপ্রবেশের বিরুদ্ধে ‘চিহ্নিত-ছাঁটাই-বহিষ্কার’ নীতি গ্রহণের ঘোষণা করা হয়েছে। পাশাপাশি গরু পাচার রুখতে কঠোর আইন, সীমান্ত নিরাপত্তায় ‘শূন্য সহনশীলতা’ এবং আইনশৃঙ্খলা প্রশ্নে শক্ত অবস্থানের কথাও দল তুলে ধরেছে। বাংলার ভোটে দীর্ঘদিনের এক বড় রাজনৈতিক ইস্যুকেই এ বার সঙ্কল্পপত্রের কেন্দ্রে বসাল বিজেপি।
কৃষক ও গ্রামীণ অর্থনীতির জন্যও একাধিক প্রতিশ্রুতি রাখা হয়েছে। ধান, আলু ও আমচাষে বিশেষ সহায়তা, ফসলের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করা, এবং প্রধানমন্ত্রী কিষান প্রকল্পে অতিরিক্ত সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতির কথা প্রকাশ্যে এসেছে। মৎস্যজীবীদের জন্যও আলাদা সহায়তা ও পশ্চিমবঙ্গকে বড় মাছ-রফতানিকারক রাজ্যে পরিণত করার লক্ষ্য সঙ্কল্পপত্রে জায়গা পেয়েছে। কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে তৃণমূলের প্রভাবভূমিতে পাল্টা জমি শক্ত করার চেষ্টাই এতে স্পষ্ট।
অবকাঠামো, স্বাস্থ্য ও উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও বড় প্রতিশ্রুতির তালিকা দিয়েছে বিজেপি। উত্তরবঙ্গে নতুন এইমস, নতুন আইআইটি, নতুন আইআইএম, ক্যানসার হাসপাতাল, নতুন টাউনশিপ, তাজপুর ও কুলপিতে গভীর সমুদ্রবন্দর, হলদিয়া বন্দরের উন্নয়ন পরিকল্পনা, পুরনো চা-বাগানের পুনরুজ্জীবন, দার্জিলিং চায়ের বিশ্ব-বাজারে নতুন ব্র্যান্ডিং—এই সব প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিজেপি স্পষ্টতই উন্নয়ন বনাম দুর্নীতির দ্বৈরথে ভোট টানতে চাইছে।
স্বাস্থ্য-সামাজিক সুরক্ষার খাতেও আয়ুষ্মান ভারত চালুর প্রতিশ্রুতি রয়েছে। পাশাপাশি মহিলাদের জন্য নির্দিষ্ট স্বাস্থ্য-পরীক্ষা, টিকাকরণ ও নিরাপত্তা অবকাঠামোর কথা তুলে ধরা হয়েছে। সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও ‘বন্দে মাতরম্’ স্মারকভিত্তিক উদ্যোগ এবং কুড়মালি ও রাজবংশী ভাষাকে অষ্টম তফসিলে অন্তর্ভুক্তির প্রতিশ্রুতি বিজেপির আঞ্চলিক ও সাংস্কৃতিক ভোটব্যাঙ্কে বার্তা দেওয়ার কৌশল হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
দুর্নীতি ইস্যুতেও সঙ্কল্পপত্রে সরাসরি আক্রমণ শানানো হয়েছে। গত ১৫ বছরের দুর্নীতির অভিযোগ খতিয়ে দেখা, শ্বেতপত্র প্রকাশ, কাটমানি সংস্কৃতি ও সিন্ডিকেট রাজ ভাঙার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে বিজেপি তাদের পুরনো আক্রমণাত্মক লাইনই বজায় রেখেছে। অর্থাৎ, এই সঙ্কল্পপত্রে একসঙ্গে দু’টি পথ ধরা হয়েছে—একদিকে নগদ সহায়তা ও সামাজিক প্রতিশ্রুতি, অন্যদিকে অনুপ্রবেশ, দুর্নীতি ও মতাদর্শের প্রশ্নে কড়া রাজনৈতিক মেরুকরণ।


