রুশ তেলের ‘ছাড়’ প্রত্যাহার করল আমেরিকা

বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের বাজারে যখন চরম অস্থিরতা, ঠিক তখনই রাশিয়ার অপরিশোধিত তেলের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞার ‘রক্ষাকবচ’ বা সাময়িক ছাড় সরিয়ে.....

বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের বাজারে যখন চরম অস্থিরতা, ঠিক তখনই রাশিয়ার অপরিশোধিত তেলের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞার ‘রক্ষাকবচ’ বা সাময়িক ছাড় সরিয়ে নিল আমেরিকা। বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটনে এক সাংবাদিক বৈঠকে মার্কিন ট্রেজারি সচিব স্কট বেসেন্ট স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, রাশিয়ার তেলের ওপর গত এক মাস ধরে যে বিশেষ ছাড় দেওয়া হয়েছিল, তার মেয়াদ আর বাড়ানো হবে না। গত ১১ এপ্রিল এই ছাড়ের মেয়াদ শেষ হয়েছে।

 

একইসঙ্গে ইরানি তেলের ক্ষেত্রেও আগামী ১৯ এপ্রিলের পর আর কোনও ছাড় দেওয়া হবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে হোয়াইট হাউস। মার্কিন ট্রেজারি সচিবের কথায়, “আমরা রুশ তেলের ওপর সাধারণ লাইসেন্স বা নিষেধাজ্ঞার ছাড় আর নবায়ন করছি না, এবং একইভাবে ইরানি তেলের ক্ষেত্রেও এই ছাড় বাড়ানো হবে না। গত ১১ মার্চের আগে যে তেল জাহাজে তোলা হয়েছিল, তার পুরোটাই ইতিমধ্যে বাজারে চলে এসেছে।” আমেরিকার এই সিদ্ধান্তের ফলে ভারতের মতো দেশগুলো, যারা গত কয়েক মাসে সস্তায় রুশ তেলের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল, তাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়া স্বাভাবিক।

 

​একজন অভিজ্ঞ সাংবাদিকের বিশ্লেষণী চোখে দেখলে বোঝা যায়, ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের এই পদক্ষেপের পেছনে রয়েছে সুদূরপ্রসারী অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি। চলতি বছরের শেষের দিকে আমেরিকায় মধ্যবর্তী নির্বাচন। তাই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের জোগান বাড়িয়ে দেশের ভেতরে জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে এই সাময়িক ছাড় দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের জেরে হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল পরিবহণ কার্যত থমকে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম এমনিতেই চড়া। এই পরিস্থিতিতে রাশিয়ার ওপর ফের নিষেধাজ্ঞার কড়াকড়ি শুরু হওয়ায় বিশ্ব অর্থনীতিতে তার প্রভাব পড়ার আশঙ্কা প্রবল। বিশেষ করে ভারত গত মার্চ ও এপ্রিল মাসে রেকর্ড পরিমাণ রুশ তেল আমদানি করেছে। পরিসংখ্যান বলছে, মার্চ মাসে ভারতের মোট তেল আমদানির ৪৪.৪ শতাংশই এসেছে রাশিয়া থেকে, যার পরিমাণ ছিল প্রতিদিন প্রায় ২০ লক্ষ ব্যারেল। বিশেষজ্ঞ মহলের মতে, ভারতের তেল শোধনাগারগুলো মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত সংস্থা বা জাহাজের সঙ্গে সরাসরি লেনদেন এড়াতেই এই ছাড়ের সুযোগ নিয়েছিল।

 

​তবে কি এবার রাশিয়ার তেলের জোগান কমবে ভারতে? বিশ্লেষকরা মনে করছেন, পরিস্থিতি ততটা সোজাসাপ্টা নয়। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ সুমিত রিতোলিয়া যেমনটা বলছেন, “ভারতের পক্ষে রুশ তেল থেকে সরে আসা এখন কার্যত কঠিন। এটি এখন আর কেবল নিষেধাজ্ঞার বিষয় নয়, বরং বর্তমান ভঙ্গুর বিশ্বব্যবস্থায় দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা এবং অর্থনীতির প্রশ্ন।” অর্থাৎ, ভারতের তেল শোধনাগারগুলো হয়তো এখন সরাসরি নিষেধাজ্ঞার তালিকায় থাকা রুশ সংস্থাগুলোকে এড়িয়ে চলবে, কিন্তু মধ্যস্থতাকারী বা ভিন্ন কোনও রুটে রুশ তেল আমদানির ধারা বজায় রাখতে চাইবে।

 

কারণ, পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের পরিস্থিতিতে ইরাক বা সৌদি আরবের তেলের চেয়ে রাশিয়ার তেলের দাম ও সরবরাহ এখনও অনেক বেশি লাভজনক। সাংবাদিক হিসেবে আমাদের নজর থাকবে সেই দিকেই, যেখানে মার্কিন রক্তচক্ষু এড়িয়ে ভারত কীভাবে নিজের জ্বালানি ভাণ্ডার অক্ষুণ্ণ রাখে। একদিকে কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখা, আর অন্যদিকে আমজনতার পকেটে তেলের দামের বোঝা না বাড়ানো—এই দুইয়ের যাঁতাকলে দাঁড়িয়ে ভারতের পরবর্তী রণকৌশলই এখন দেখার বিষয়। নিছক একটি ছাড় প্রত্যাহার নয়, বরং এর মধ্য দিয়ে ২০২৬-এর বিশ্ব রাজনীতির এক নতুন মেরুকরণ স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

আরও পড়ুন