পশ্চিমবঙ্গের ভোটাররা দুই সাংবিধানিক সংস্থার চাপে পড়ে স্যান্ডউইচ হয়ে যাচ্ছেন। ভারতে বসবাসকারী এবং জন্মগ্রহণকারী নাগরিকদের ভোটাধিকার শুধুমাত্র সাংবিধানিক অধিকার নয় এটা তাদের আবেগের বিষয়। জাতীয় নির্বাচন কমিশনকে এই বিষয়টি নজরে রাখতে হবে।’ সুপ্রিম কোর্টে পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকায় স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন বা এসআইআর সংক্রান্ত মামলার শুনানিতে এভাবেই জাতীয় নির্বাচন কমিশনকে সতর্ক করলেন সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত।
তবে স্পষ্ট হয়ে গেল এসআইআরের ট্রাইব্য়ুনালে আবেদন করলেও কোনও লাভ নেই, ভোটাধিকার থাকছে না। এবারের বিধানসভা নির্বাচনে ভোট দিতে পারবেন না বিচারাধীন থাকা ও ভোটার লিস্টে এসআইআরের ফলে ডিলিটেড ভোটাররা। আজ, সোমবার বাংলার এসআইআর সংক্রান্ত মামলায় এমনই মন্তব্য সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের। বিচারপতি জয়মাল্য বাগচি কমিশনের আইনজীবীকে মনে করিয়ে দিয়েছেন, ভোটাধিকার শুধুমাত্র একজন ভোটারের সাংবিধানিক অধিকারই নয়, এর সঙ্গে মানুষের ভাবাবেগও জড়িয়ে রয়েছে।
পাশাপাশি, বিচারপতি বাগচি প্রশ্ন করেছেন, অন্য কোনও রাজ্যে এসআইআর-এ লজিক্যাল ডিস্ক্রিপ্যান্সি বা যুক্তিগ্রাহ্য অসঙ্গতির বিষয়টি রাখা না হলেও শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গে কেন এসআইআর-এ এই ব্যবস্থা রাখা হল? বিচারপতি জয়মাল্য বাগচি কমিশনের আইনজীবীকে আরও মনে করিয়ে দিয়েছেন, বিহারে এসআইআর চলাকালীন কমিশনই শীর্ষ আদালতে জানিয়েছিল, ২০০২-এর ভোটার তালিকায় নাম থাকলে ভোটারদের কোনও নথি জমা দিতে হবে না। নিজেদের সেই বক্তব্য থেকেও কমিশন সরে এসেছে বলে এ দিন মন্তব্য করেছেন বিচারপতি বাগচি। ২০০২-এর ভোটার তালিকায় নাম থাকলেও ভোটারদের লজিক্যাল ডিস্ক্রিপ্যান্সির আওতায় ফেলে তাঁদের থেকে নথি চাওয়া হয়েছে, এ দিন কমিশনকে মনে করিয়ে দিয়েছেন বিচারপতি বাগচি।প্রধান বিচারপতির বেঞ্চ আরও জানিয়েছে, ট্রাইবুনালে জমা পড়া আবেদন খতিয়ে দেখার ব্যবস্থা ত্রুটিমুক্ত এবং কঠোর হওয়া উচিত।
কারণ একজন বিচারক যদি দিনে ১০০০ ভোটারের নথি দেখেন, তাহলে তাঁর পক্ষে ৭০ শতাংশের বেশি কাজ ত্রুটিমুক্ত ভাবে করা সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেছেন বিচারপতি জয়মাল্য বাগচি। বিচারপতি বাগচীর একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ, বাংলার মতো লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি আর কোনও রাজ্যে হয়নি। কমিশনকে এদিন সুপ্রিম কোর্টে বেশ কিছু প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়। কমিশনের তরফ থেকে আইনজীবী ডিএস নাইডু পাল্টা কমিশনের অবস্থান তুলে ধরছিলেন, কেন বিহারের ক্ষেত্রে এক ধরনের নিয়ম ছিল, আর বাংলার ক্ষেত্রে লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি চালু করা হয়। তখন খুব স্পষ্টভাবে বিচারপতি বাগচী বলেন, ‘আপনি এমন একজনের কাছে মডেল ফর্ম দিচ্ছেন, যিনি ইতিমধ্যেই ফর্ম পূরণ করেছেন।’ অর্থাৎ বিচারপতি বাংলার এসআইআর-এ অংশ নিয়েছেন, অর্থাৎ সমস্তটাই জানেন।
সেক্ষেত্রে বিচারপতির মুখে উঠে আসে ২০০২ সালের ভোটার তালিকার কথাও। বিচারপতির প্রশ্ন, আগে কমিশন যখন বলেছিল, ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় নাম থাকলেই হবে, তাঁদের আলাদা করে নথি জমা দিতে হবে না। কিন্তু বাংলার ক্ষেত্রে কমিশনের আইনজীবী বলেন, ২০০২ সালে যাঁদের নাম রয়েছে, তাঁরা একই ব্যক্তি কিনা, সেটা দেখতেই নথি। কারণ অনেকের নামের পরিবর্তন হয়েছে। তখন বিচারপতি বাগচী বলেন, কমিশন তাদের আগের অবস্থান থেকে সরে যাচ্ছে। কমিশনের আইনজীবী নাইডুর উদ্দেশে বিচারপতি বাগচী বলেন, ‘আমাদের ‘ন্যায্য প্রক্রিয়ায় অধিকার রক্ষা করতে হবে।’ আইনজীবী নাইডু তখন বলেন, ‘যখন আমরা লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি তালিকা প্রকাশ করেছি এবং মানুষকে জানানো হয়েছে, তখন তারা আপত্তি জমা দিতে পারে। অনুগ্রহ করে লক্ষ্য করুন, ৪৭ শতাংশ আবেদন বাতিল হয়েছে।’ এই মামলায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট উঠে এসেছে।
সেটা হচ্ছে মামলাকারীর পক্ষ থেকে আবেদন ছিল, যে তাঁদের ভোটার লিস্ট থেকে নাম বাদ গিয়েছে, কিন্তু তাঁদের পাসপোর্ট রয়েছে, আধার কার্ড রয়েছে। এবং তাঁরা ট্রাইবুনালে তাঁরা নাম তুলতে পারছেন না, কারণ শুনানির সুযোগই পাচ্ছেন না। এতে সুপ্রিম কোর্টের তরফ থেকে পরিষ্কার করে বলা হয়, যে ট্রাইবুনাল আজকে থেকেই কাজ শুরু করেছে, এটা কলকাতা হাইকোর্টে প্রধান বিচারপতি সুপ্রিম কোর্টকে জানিয়েছেন। এইভাবে ট্রাইবুনালকে ব্ল্যাকমেল করা যায় না। ট্রাইবুনাল তার নিজের পদ্ধতিতে কাজ করবে। এবং সেখানে একটা সিস্টেম অনুযায়ী কাজ হচ্ছে। ফলে সেই কাজের জন্য তাঁদের উপরেই নির্ভর করতে হবে। এবং তাঁদের সিদ্ধান্ত তাঁরাই চূড়ান্ত নেবেন।


