পদ্মফুলে ভোট দেওয়া মানেই নিজের বিপদ নিজে ডেকে আনা।’ শনিবার পশ্চিম বর্ধমানের বারাবনির জনসভা থেকে ঠিক এই ভাষাতেই ভোটারদের কড়া হুঁশিয়ারি দিলেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর দাবি, বিজেপি মানেই ‘ঘুষখোর, মাতাল, পাতাখোর ও দুর্নীতিবাজদের’ আস্তানা। এদিন পানুরিয়া হাসপাতাল গ্রাউন্ডের জনসভা থেকে অভিষেক বারাবনির প্রার্থী বিধান উপাধ্যায়কে জেতানোর পাশাপাশি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে চতুর্থবারের জন্য মুখ্যমন্ত্রী করার জোরালো আহ্বান জানান। তাঁর সাফ কথা, ‘এবার এমন ভোট দিতে হবে যাতে আগামী ১০০ বছরেও বিজেপি এখান থেকে লড়াই করার মতো কোনো প্রার্থী খুঁজে না পায়।’ জয়ের ব্যবধান গতবারের ২৩ হাজার থেকে বাড়িয়ে অন্তত ৪০ হাজার করার লক্ষ্যমাত্রা এদিন বেঁধে দেন তিনি।
শনিবার দুপুরে নীল-সাদা হেলিকপ্টার যখন পানুরিয়ার অস্থায়ী হেলিপ্যাডে নামে, তখন ঘড়িতে দুপুর দেড়টা। ধুলো উড়িয়ে হেলিকপ্টার নামার পরেই জনসমুদ্রে উন্মাদনা ছড়িয়ে পড়ে। মঞ্চে অভিষেককে স্বাগত জানান জেলা সভাপতি নরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, মন্ত্রী মলয় ঘটক, প্রদীপ মজুমদার এবং বারাবনির ঘরের ছেলে বিধান উপাধ্যায়ের মতো হেভিওয়েট নেতারা। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন ভি শিবদাসন ওরফে দাসু ও কবি দত্ত। ভিড় ঠাসা জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে তৃণমূলের সেকেন্ড-ইন-কমান্ডের গলায় শুরু থেকেই শোনা গেল চড়া সুর। বারাবনির বিজেপি প্রার্থী অরিজিৎ রায়ের বিরুদ্ধে গুন্ডামির অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, ‘এই প্রার্থীর কুকীর্তি এলাকার সবার জানা। গত ৫ মার্চ রথযাত্রা থেকে তৃণমূল কর্মীদের ওপর হামলা করা থেকে শুরু করে নিজের দলেরই তিন নেতাকে দলীয় কার্যালয়ে পেটানো— সবটাই করেছেন উনি। অরিজিৎকে ভোট দেওয়া মানে এলাকায় নতুন করে দুষ্কৃতীরাজ কায়েম করা।’ এমনকি জেলা বিজেপি কার্যালয় এখন সরাসরি ‘কয়লা মাফিয়াদের’ দখলে চলে গিয়েছে বলেও সভায় গুরুতর অভিযোগ তোলেন তিনি।
উন্নয়নের খতিয়ান তুলে ধরে অভিষেক দাবি করেন, গত ১৫ বছরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার বারাবনি ও পশ্চিম বর্ধমানের ভোল বদলে দিয়েছে। জনতাকে উদ্দেশ্য করে তাঁর আহ্বান, ‘বিজেপির ১২ বছরের রিপোর্ট কার্ড আর আমাদের ১৫ বছরের কাজের খতিয়ান মিলিয়ে দেখুন। উন্নয়ন কার সময়ে হয়েছে সেটা নিজেরাই বুঝতে পারবেন।’ নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে মাল্টি সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল কিংবা পুলিশ কমিশনারেট গঠন— সবটাই তৃণমূলের আমলের অবদান বলে তিনি উল্লেখ করেন। পরিসংখ্যান দিয়ে অভিষেক জানান, ২০২৩ সাল থেকে আসানসোল জেলা হাসপাতালে ক্যান্সারের চিকিৎসা এবং বিনামূল্যে কেমোথেরাপি শুরু হয়েছে। শিশুদের জন্য তৈরি হয়েছে আধুনিক নিউনেটাল ইউনিট। বারাবনিতে ৬১ হাজার ১০৮ জন মহিলা ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ পাচ্ছেন এবং ২ লক্ষ ৩৩ হাজার মানুষ ‘খাদ্যসাথী’ প্রকল্পের আওতায় রয়েছেন। যুবশ্রী ও কৃষক বন্ধু প্রকল্পের সুবিধাভোগীদের দীর্ঘ তালিকাও তিনি পাঠ করেন। পথশ্রী প্রকল্পে ১৬০ কিমি রাস্তা তৈরিতে ৬০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে বলে জানান তিনি।
আগামী দিনের রোডম্যাপ হিসেবে তৃণমূলের নির্বাচনী ইশতেহারের ১০টি প্রতিজ্ঞার মধ্যে প্রধান ৫টি এদিন বিশদ ব্যাখ্যা করেন অভিষেক। তিনি স্পষ্ট জানান, কেন্দ্রীয় সরকার বাংলার হকের টাকা দিক বা না দিক, আগামী ৫ বছরের মধ্যে রাজ্যের সবার মাথার ওপর পাকা ছাদ নিশ্চিত করবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার। এছাড়া ২০৩১ সালের মধ্যে প্রতিটি বাড়িতে নলবাহিত পরিশ্রুত পানীয় জল পৌঁছানো এবং ‘দুয়ারে সরকার’-এর ধাঁচে ‘দুয়ারে স্বাস্থ্য’ পরিষেবা চালুর প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি। বার্ধক্য ভাতা নিয়ে বিরোধীদের কুৎসা নস্যাৎ করে অভিষেক আশ্বাস দেন, যারা আবেদন করেছেন, তারা তো পাবেনই, যারা আগে থেকে পাচ্ছেন তাদের সুবিধাও অব্যাহত থাকবে। ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ প্রসঙ্গে তাঁর দাবি, বিজেপি এক এক সময় এক এক কথা বলছে, কিন্তু বিজেপি শাসিত কোনো রাজ্যে এমন প্রকল্প নেই। বাংলার মহিলারা এই প্রকল্পে আজীবন সুরক্ষিত থাকবেন বলে তিনি প্রতিশ্রুতি দেন।
বারাবনি ও সালানপুরের পাথর খাদান ও ক্র্যাসার শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের যন্ত্রণার কথাও এদিন অভিষেকের বক্তব্যে উঠে আসে। সিলিকোসিস আক্রান্ত শ্রমিকদের কষ্টের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমি জানি ৮ থেকে ১০ হাজার শ্রমিক এখানে পাথর খাদানে কাজ করে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তাদের সব রকম সুবিধা দেবে রাজ্য সরকার। তাদের জন্য আলাদা একটি জনকল্যাণমুখী পরিকল্পনা তৈরি করা হচ্ছে।’ একইসঙ্গে মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে মোদী সরকারকে তীক্ষ্ণ আক্রমণ শানান তৃণমূল সাংসদ। সাধারণ মানুষের ক্ষোভকে উসকে দিয়ে তাঁর প্রশ্ন, ‘২০১৪ সালে ৪০০ টাকার গ্যাস আজ ১০০০ টাকা কেন? জিরে থেকে কেরোসিন, মাছ, মাংস থেকে ডিম— সবকিছুর দাম আজ কোথায় নিয়ে গিয়েছে মোদী সরকার?’
বিজেপিকে বিঁধে তাঁর শেষ হুঁশিয়ারি, যে সরকার সাধারণ মানুষকে দীর্ঘ লাইনে দাঁড় করিয়েছে, সেই সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার সময় এসেছে। ভোটারদের প্রতি তাঁর আবেগঘন আবেদন, ‘আজ যেমন প্রখর রোদ উপেক্ষা করে কষ্ট করে সভায় এসেছেন, ভোটের দিনও ঠিক তেমনই কষ্ট করে লাইনে দাঁড়িয়ে নিজেদের রায় দিয়ে দিন।’ কেন্দ্রীয় বঞ্চনা আর মূল্যবৃদ্ধির ইস্যুকে হাতিয়ার করে অভিষেক বুঝিয়ে দিলেন, পশ্চিম বর্ধমানের শিল্পাঞ্চলে বিজেপিকে এক ইঞ্চি জমিও ছাড়বে না ঘাসফুল শিবির। সব মিলিয়ে, শনিবারের বারাবনি থেকে বিজেপিকে রাজনৈতিকভাবে ‘বিসর্জনের’ কড়া বার্তা দিয়ে ভোটের ময়দানে রণদামামা বাজিয়ে দিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে চতুর্থবার ক্ষমতায় ফেরানোর লক্ষ্যেই যে এই লড়াই, তা বারেবারে মনে করিয়ে দিলেন তিনি। বারাবনির মাটি থেকে মোদী সরকারের পতন ঘটানোর ডাক দিয়ে সভার সমাপ্তি ঘটান অভিষেক।


