‘অপরিণত, স্বৈরাচারী, স্বেচ্ছাচারী। সারা পৃথিবীতে এমন শাসক, এমন রাজনৈতিক দল নেই। আমার শোনা কথা একটা বলি। এখানে ইন্ডাস্ট্রিতে চাকরি হলে বাইরের লোকেরা টাকা দিয়ে নিয়ে নেয়। লোকালরা পায় না। আমি কথা দিচ্ছি, আপনারা যদি বাপ্পা, প্রদীপদাকে জেতান, এই সিস্টেম আমি বন্ধ করে দেব। তার পর যদি কেউ করে, দেখে নেব তার কত বড় সাহস! তৃণমূল কংগ্রেসের তার ঠাঁই হবে না। সে যে-ই হোক, যত বড় কেউকেটা হোক।
অনেককে বাদ দিয়েছি। পরেও করব। আমার কর্মীরা অন্যায় করলে তাদের গালে থাপ্পড় দিতে পারি। এই ভালবাসা, অধিকার আমার আছে।’ পশ্চিম বর্ধমান জেলার দুর্গাপুরে চতুরঙ্গ ময়দানে দুর্গাপুর পূর্ব এবং পশ্চিম বিধানসভার দুই প্রার্থী প্রদীপকুমার মজুমদার এবং কবি দত্তের সমর্থনে সভা থেকে এভাবেই বিজেপির উদ্দেশ্যে তীব্র আক্রমণ করলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বিজেপি নেতাদের উদ্দেশ্যে হুঁশিয়ারি দিয়ে মমতা বলেন, ‘মাথায় রেখো বিজেপি এবং তার তোতাপাখি, বাংলাকে নিয়ে খেলতে এসো না। বড্ড বাড়াবাড়ি করে ফেলেছো। অতি বাড় বেড়ো না, ঝড়ে পড়ে যাবে। বিজেপিকে বিশ্বাস করবেন না। ডেঞ্জারাস! ডেঞ্জারাস! ৪৪০ ভোল্ট! একটা চেয়ারে থেকে কেউ মিথ্যা বলে? আমি যে কথা বললাম, চাইলে ক্রস চেক করুন। আমি বাজে কথা বলি না। তথ্য দিয়ে বলি। বলছে, বিজেপি এসে সেভেন্থ পে কমিশন চালু করবে। আরে সেভেন্থ পে কমিশন হয়ে গিয়েছে।
খবর তো নিন। গান আছে, শুনেছেন তো? ‘চোখে চোখে কথা বলো, মুখে কিছু বলো না’। বিজেপি নেতারা কানে কানে যা বলেন তাই বলেন। কানে কানে কথা বলো, সত্যি বলো না। ভাঁওতাবাজ! মহিলাদের এঁরা সম্মান দেবেন! আর মুখ খুলছি না। বুঝে নিন। ইশারাই কাফি। রেজাল্ট দেখে বলবেন, দেখ কেমন লাগে! বাংলাকে দেখবে আপর লুচির মতো ফুলবে। ওরা কিচ্ছু দেবে না। সব কেড়ে নেবে। কিছু টাকা অ্যাকাউন্টে ঢুকিয়ে সব টাকা কেড়ে নেবে’। পাশাপাশি সিপিএম বিজেপি এবং কংগ্রেসের মধ্যে গোপন আঁতাত রয়েছে বলে অভিযোগ করে মমতার বক্তব্য, ‘কোথাও কংগ্রেসের সঙ্গে, কোথাও সিপিএমের সঙ্গে আন্ডারস্টান্ডিং করে ভোট করেছে। আর আমাদের এখানে পাঁচশোর বেশি অফিসারকে বদলি করে দিয়েছে! কেন? যাতে ড্রাগ ধরতে না পারে। বর্ডার দিয়ে টাকা ঢোকার সময় ধরতে না পারে সে জন্য। এক পক্ষ রাজনীতি করছে। এই ভাবে দেশ চলছে। আপনি আমাকে কী ধরবেন? ২ লক্ষ পুলিশ নিয়ে আসছে দিল্লি থেকে। কেউ ভয় পাবেন না। এজেন্টরা শক্ত থাকবেন। কেউ বিজেপিকে ভোট দেবেন না।
আমি মানুষকে চিনি। প্রধানমন্ত্রীর মিটিংয়ে বাইরে থেকে ট্রেনে করে লোক আনে। ৫০০ টাকা দিয়ে। আমাকে বাইরে থেকে লোক আনতে হয় না। আমায় ভালবেসে মানুষ আসেন’। ‘আমরা কোনও বুলডোজার নীতিতে বিশ্বাস করি না, আমরা ভালোবাসায় বিশ্বাসী।’ বাংলায় ভোট প্রচারে এসে উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ বুলডোজার চালানোর যে নীতির কথা ঘোষণা করেছিলেন সোমবার তার পাল্টা দিলেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সোমবার সিউড়িতে দলীয় প্রার্থীদের হয়ে প্রচারে গিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী কাল এসে এখানে বলেছেন, উত্তরপ্রদেশের মতো এখানেও বুলডোজার চলবে। মানেটা কী? আমরা বুলডোজার-নীতিতে বিশ্বাস করি না। আমরা ভালোবাসার নীতি বিশ্বাস করি। বিজেপির কাছ থেকে টাকা নেবেন না। ভুল করবেন না।
আমার কাজ আপনাদের সতর্ক করা। অ্যাকাউন্ট বানিয়ে টাকা দেবে বলে কালো টাকা দিয়ে দেবে। তার পর ইডি-সিবিআইয়ের মামলা করবে।’ সেই সঙ্গে বীরভূমের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক কর্মসূচিকে হাতিয়ার করে একদিকে যেমন তিনি উন্নয়নের খতিয়ান পেশ করলেন, অন্যদিকে তেমনই কেন্দ্রীয় সরকার ও বিজেপির বিরুদ্ধে সুর চড়ালেন তীব্র ভাষায়। নিজের শৈশবের স্মৃতিবিজড়িত এই জেলায় দাঁড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রী আবারও স্পষ্ট করে দিলেন যে, আগামী নির্বাচনে রাজ্যের ২৯৪টি আসনেই লড়াইয়ের মুখ আসলে তিনি নিজেই। বীরভূমের জন্য ডেউচা পাঁচামি প্রকল্পের গুরুত্ব তুলে ধরে মমতা জানান, এই মেগা প্রজেক্টে ৩২ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ হতে চলেছে, যা প্রায় ২ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করবে।
বাংলায় চলমান ১০৫টি সামাজিক প্রকল্পের কথা উল্লেখ করে তিনি চ্যালেঞ্জের সুরে জানান, দেশের আর কোথাও এমন জনকল্যাণমূলক কাজের নজির নেই। লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের সাফল্যের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি বিহারে কেন্দ্রীয় প্রকল্পের টাকা ফেরত নেওয়ার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বিজেপিকে ‘ভাঁওতাবাজ’ বলে কটাক্ষ করেন। এদিন ভোটারদের সতর্ক করে তিনি জানান, কালো টাকা অ্যাকাউন্টে পাঠিয়ে পরবর্তীতে ইডি বা সিবিআই দিয়ে সাধারণ মানুষকে হেনস্থা করার ছক কষছে গেরুয়া শিবির। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির উদ্দেশ্যে খোলা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে মমতা বলেন, ‘যদি সত্যিই বাংলার ২৯৪টি আসনে লড়তে চান, তাহলে প্রধানমন্ত্রীর পদ ছেড়ে দিয়ে ঘোষণা করুন যে আপনি বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হতে চান। সেই ভিত্তিতেই ভোট চান’। এখানেই শেষ নয়, প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে নেত্রীর প্রশ্ন,‘আগে আপনি বলুন তো, দেশের প্রধানমন্ত্রী হবেন নাকি বাংলার মুখ্যমন্ত্রী? আপনি তো বাংলায় বহিরাগত। আগে দিল্লি সামলান। তার পর বাংলার কথা ভাববেন’।
বাংলার প্রচার সভায় প্রধানমন্ত্রীর বিপুল কর্মসংস্থানের দাবিকে তুলোধোনা করে পাল্টা নেত্রী প্রশ্ন তোলেন, ‘মোদীবাবুকে জিজ্ঞাসা করুন, কর্মসংস্থানের কী হলো। করবেন বলছেন কিন্তু এতদিন করেননি কেন? আপনারও তো ১২ বছর হলো। ২ কোটি চাকরি কোথায় গেল? রেলে গ্যাংম্যান নেয়নি। সেনায় একাধিক পোস্ট এখনও শূন্য। এ দিকে আমরা শূন্যপদ পূরণ করতে গেলেই কোর্টে কেস দেয়। যাতে চাকরিগুলো আটকে যায়। এখন চাকরির কথা! এ সব ছলনা আর বাংলার মানুষের সঙ্গে করতে এসো না’। কর্মসংস্থান প্রসঙ্গে মমতা এ দিনের সভা থেকে থেকে জানিয়েছেন, দেউচা পঁচামিতে ৩২ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ হবে এবং ২ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান হবে। নরেন্দ্র মোদীর ‘মন কী বাত’ অনুষ্ঠান নিয়েও আক্রমণ শানান তৃণমূল সুপ্রিমো। তাঁর কথায়, ‘বাচ্চাদের সঙ্গে কথা বলার নাম করে বাচ্চাদের মাথা খাচ্ছে’।

