পুতিনের ‘ডিজিটাল লৌহ পর্দা’: ইন্টারনেটে কঠোর সেন্সরশিপের প্রতিবাদে উত্তাল রাশিয়া, চরম সংকটে সাধারণ জনজীবন ও ব্যবসা

রাশিয়ার আকাশসীমায় এখন শুধু ড্রোনের আনাগোনা নয়, বরং এক অদৃশ্য ‘ডিজিটাল লৌহ পর্দা’ ক্রমশ ঘনীভূত হচ্ছে। ক্রেমলিনের অদূরেই সম্প্রতি এক.....

রাশিয়ার আকাশসীমায় এখন শুধু ড্রোনের আনাগোনা নয়, বরং এক অদৃশ্য ‘ডিজিটাল লৌহ পর্দা’ ক্রমশ ঘনীভূত হচ্ছে। ক্রেমলিনের অদূরেই সম্প্রতি এক বিরল দৃশ্য চোখে পড়েছে, যেখানে কয়েক ডজন মানুষ লাইনে দাঁড়িয়ে প্রেসিডেন্টের দপ্তরে পিটিশন জমা দিচ্ছেন। তাঁদের দাবি একটাই— ইন্টারনেটের ওপর থেকে সরকারের কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও সেন্সরশিপ তুলে নিতে হবে। পুতিন প্রশাসনের এই নজিরবিহীন পদক্ষেপে সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত যোগাযোগ থেকে শুরু করে অনলাইন ব্যবসা— সবই এখন খাদের কিনারে।

 

বিশেষ করে হোয়াটসঅ্যাপ এবং টেলিগ্রামের মতো জনপ্রিয় মেসেজিং অ্যাপগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং প্রায়ই মোবাইল ইন্টারনেট সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়ার ফলে সাধারণ নাগরিকদের মনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। ইউলিয়া নামে এক ক্যাটারিং ব্যবসার মালিক জানিয়েছেন যে, তাঁর পুরো ব্যবসাই ইন্টারনেটের ওপর নির্ভরশীল, কিন্তু সরকারের এই নতুন বিধিনিষেধের কারণে তাঁর ওয়েবসাইট অচল হয়ে পড়েছে এবং তিনি ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। পুতিন যদিও দাবি করেছেন যে সন্ত্রাসবাদ রুখতে এই ‘অপারেশনাল ওয়ার্ক’ প্রয়োজন, কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে এটি আসলে সরকারি নজরদারি ও তথ্য নিয়ন্ত্রণের এক চরম বহিঃপ্রকাশ ছাড়া আর কিছুই নয়।

 

রাশিয়ান কর্তৃপক্ষের দাবি, মোবাইল ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট করলে ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলার লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়া সহজ হয়, যদিও বাস্তবে এমন ব্ল্যাকআউটের মধ্যেও ড্রোন হামলা অব্যাহত রয়েছে। এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে সরকার এখন ‘ম্যাক্স’ নামে একটি রাষ্ট্রায়ত্ত মেসেজিং সার্ভিস ব্যবহারের জন্য জনগণকে উৎসাহিত করছে, কিন্তু সাধারণ মানুষের মধ্যে এটি নিয়ে প্রবল আতঙ্ক বিরাজ করছে। অনেকেই মনে করছেন, এই অ্যাপটি মূলত তৈরিই করা হয়েছে নাগরিকদের ব্যক্তিগত বার্তার ওপর সরাসরি নজরদারি চালানোর জন্য।

 

রাশিয়ার অনেক অংশে এখন মোবাইল ফোনে কেবল সরকারি অনুমোদিত ওয়েবসাইটগুলোই খোলা যাচ্ছে, যা দেশটিকে বহির্বিশ্ব থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ক্রেমলিন বিশ্বাস করে যে পশ্চিমী দেশগুলোর উদারপন্থী চিন্তাভাবনা রুশ নাগরিকদের মস্তিষ্কের জন্য বিষস্বরূপ, আর সেই কারণেই এই বিচ্ছিন্নের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা হচ্ছে। ভ্লাদিমির শহরে এই বিধিনিষেধের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার চেষ্টা করেছিলেন সমাজকর্মী ইউলিয়া গ্রেকোভা, কিন্তু স্থানীয় প্রশাসন রাস্তা পরিষ্কার বা ড্রোন হামলার অছিলায় সেই আবেদন খারিজ করে দিয়েছে। এমনকি পুলিশ সরাসরি তাঁর কর্মস্থলে গিয়ে তাঁকে সতর্ক করে এসেছে।

 

বর্তমানে রাশিয়ার সাধারণ মানুষের মধ্যে একধরণের চাপা উত্তেজনা ও বিরক্তি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ট্যাক্সি বুকিং থেকে শুরু করে দৈনন্দিন কেনাকাটা— সবক্ষেত্রেই ইন্টারনেট বিভ্রাট তাঁদের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। রাশিয়ার প্রাক্তন সংসদ সদস্য বরিস নাদেজদিন মনে করেন যে, মুদ্রাস্ফীতি এবং স্বাস্থ্যসেবার সংকটের পর ইন্টারনেটের এই সমস্যা পুতিনের জনপ্রিয়তায় বড় ধরণের ধস নামিয়েছে। সমীক্ষায় দেখা গেছে যে ২০২২ সালের পর পুতিনের রেটিং এখন সর্বনিম্ন পর্যায়ে।

 

ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ যদিও আশ্বাস দিয়েছেন যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে সব পরিষেবা ফিরিয়ে দেওয়া হবে, কিন্তু রুশ নাগরিকদের বড় অংশই এখন অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা ভেবে আতঙ্কিত। অনেকেই মনে করছেন, রাশিয়া এখন ক্রমশ অতীতের দিকে পিছিয়ে যাচ্ছে যেখানে বাকস্বাধীনতা এবং বহির্বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল স্বপ্নের মতো। বর্তমান রাশিয়ায় মানুষের ক্ষোভের এই পুঞ্জীভূত মেঘ ভবিষ্যতে কোন পথে মোড় নেয়, এখন সেটাই দেখার বিষয়। তবে আপাতত রাশিয়ার সাধারণ মানুষ তাঁদের দাদামশাই বা বাবা-মায়ের মতো এই কঠিন পরিস্থিতির সঙ্গে কোনোমতে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছেন।

আরও পড়ুন