জঙ্গলে মোবাইল-সেলফিতে ‘না’: বন্যপ্রাণী পর্যটনে কড়া নিয়ম আনল সুপ্রিম কোর্ট

ভারতের ব্যাঘ্র প্রকল্পগুলোতে এখন আর জিপে বসে জঙ্গল দাপানোর সময় ইচ্ছেমতো মোবাইল ফোনে সেলফি তোলা বা ভিডিও করার সুযোগ মিলবে.....

ভারতের ব্যাঘ্র প্রকল্পগুলোতে এখন আর জিপে বসে জঙ্গল দাপানোর সময় ইচ্ছেমতো মোবাইল ফোনে সেলফি তোলা বা ভিডিও করার সুযোগ মিলবে না। সুপ্রিম কোর্টের এক সাম্প্রতিক নির্দেশের পর দেশের একাধিক ব্যাঘ্র প্রকল্পের কোর এরিয়া বা মূল পর্যটন এলাকায় মোবাইল ফোন ব্যবহারের ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে দেওয়া এই ঐতিহাসিক রায়ের পর বর্তমানে কার্যকর হওয়া এই বিধিনিষেধের মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষ এবং বন্যপ্রাণী— উভয়েরই নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। পর্যটকদের অনিয়ন্ত্রিত আচরণ এবং ছবি তোলার উন্মাদনা যে বন্যপ্রাণীদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে বিপন্ন করে তুলছে, তা মাথায় রেখেই এই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। গত ফেব্রুয়ারি মাসে রণথমভোর জাতীয় উদ্যানের একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছিল, যেখানে দেখা যায় একদল পর্যটক তাঁদের সাফারি গাড়ি দিয়ে একটি বাঘকে চারদিক থেকে ঘিরে ধরেছেন এবং চিৎকার করে ছবি তুলছেন। এই ধরণের পরিস্থিতিকে বিশেষজ্ঞরা “সাফারি জ্যাম” বলে অভিহিত করছেন, যা বন্যপ্রাণীদের জন্য চরম মানসিক চাপের সৃষ্টি করে।

নতুন নিয়ম অনুযায়ী, ব্যাঘ্র প্রকল্পে ঢোকার আগে পর্যটকদের তাঁদের মোবাইল ফোন একটি নির্দিষ্ট বক্সে জমা রাখতে হবে অথবা সাইলেন্ট মোডে রেখে ব্যাগের ভেতরে রাখতে হবে। আইনি নির্দেশ অনুযায়ী, কোর অঞ্চলের পর্যটন জোনে কোনোভাবেই ফোন ব্যবহারের অনুমতি মিলবে না। এর পাশাপাশি সূর্যাস্তের পর থেকে ভোর পর্যন্ত জরুরি পরিষেবা ছাড়া সমস্ত সাধারণ যানবাহনের চলাচল নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং জঙ্গল সংলগ্ন এলাকায় যথেচ্ছ নির্মাণকাজেও রাশ টানা হয়েছে। অভিজ্ঞ সাংবাদিকদের মতে, পর্যটকরা অনেক সময় বন্যপ্রাণীর সঙ্গে ছবি তুলতে গিয়ে বিপজ্জনকভাবে বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। অতীতে এমন নজিরও রয়েছে যেখানে সেলফি তুলতে গিয়ে গাড়ি থেকে ফোন পড়ে যাওয়ায় গাইডকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তা উদ্ধার করতে হয়েছে। এমনকি মা সেলফি তোলায় ব্যস্ত থাকায় জিপ থেকে শিশু ছিটকে পড়ে যাওয়ার মতো ভয়াবহ ঘটনাও ঘটেছে, যখন বাঘ ছিল মাত্র কয়েক ফুট দূরত্বে।

ভারত এখন বিশ্বের প্রায় ৭৫ শতাংশ রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের বাসস্থান। ২০১০ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে বাঘের সংখ্যা দ্বিগুণ হলেও বন্যপ্রাণীদের প্রতি পর্যটকদের শ্রদ্ধাবোধ তেমন বাড়েনি। প্রকৃতিবিদদের মতে, সাফারি চালকদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের মাধ্যমে বাঘের অবস্থান জানানো এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় জিওট্যাগ করা ছবি পোস্ট করার ফলে বাঘের নির্দিষ্ট অবস্থানের সামনে প্রচুর গাড়ির ভিড় জমে যায়। এতে বাঘের স্বাভাবিক গতিবিধি ও শিকার ব্যাহত হয়। শুধু ভারত নয়, কেনিয়াতেও বুনো মোষের অভিবাসনের পথে পর্যটকদের বাধা দেওয়ার ঘটনায় কঠোর নিয়ম আনা হয়েছে। একইভাবে মেরু ভাল্লুক দেখার ক্ষেত্রেও স্বালবার্ডে নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রাখার কড়াকড়ি শুরু হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পর্যটনের মূল উদ্দেশ্য কেবল বাঘ দেখা নয়, বরং গোটা অরণ্যের বাস্তুতন্ত্র ও নিস্তব্ধতাকে উপভোগ করা হওয়া উচিত। নতুন এই বিধিনিষেধের ফলে হয়তো বাঘের দেখা পাওয়ার সম্ভাবনা কিছুটা কমবে বা ছবি তোলার সুযোগ হারাবেন পর্যটকরা, কিন্তু বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের বৃহত্তর স্বার্থে এই পরিবর্তন অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করছে আদালত ও পরিবেশবিদরা। নিছক ছবি তোলা নয়, জঙ্গলের অংশ হওয়াটাই এখন বন্যপ্রাণী পর্যটনের নতুন মন্ত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আরও পড়ুন