আন্তর্জাতিক বিপর্যয় ও বিশেষ প্রতিবেদন, কাঠমান্ডু ও বেজিং, ২ সেপ্টেম্বর: হিমালয়ের কোলে প্রকৃতির নজিরবিহীন তাণ্ডবে মৃত্যু ও নিখোঁজের সংখ্যা ক্রমশ পাহাড়প্রমাণ আকার নিচ্ছে। গত ২৬ আগস্ট লাংটাং লিরুংয়ের হিমবাহ ধসে নেপাল জুড়ে নেমে আসা প্রলয়ঙ্করী হড়পা বানে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে অন্তত ১,১১৪ জনে এবং এখনও নিখোঁজ প্রায় ৪,০০০ মানুষ। সপ্তাহ পেরিয়ে যাওয়ার পর ধ্বংসস্তূপের নিচে নতুন করে জীবিত মানুষের সন্ধান মেলার সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে এলেও, জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলির সুড়ঙ্গে আটকে থাকা কয়েক ডজন শ্রমিক এখনও বেঁচে আছেন বলে জোরালো আশা প্রকাশ করেছে নেপাল সরকার। নেপাল বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের এক শীর্ষকর্তা জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত চারটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের পাওয়ার হাউসে বসবাস ও আশ্রয় নেওয়ার মতো শক্তপোক্ত স্থান রয়েছে।
বিশেষ করে ‘ত্রিশূলী-৩এ’ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে নিরাপদ শুকনো জায়গা এবং পর্যাপ্ত বাতাসের জোগান থাকায় সেখানে আটকে থাকা প্রায় একশো শ্রমিকের জীবিত থাকার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। তাঁদের কাছে পৌঁছানোর জন্য পাইপের মাধ্যমে অক্সিজেন পাঠানোর চেষ্টা চলছে। ভারত, চিন এবং আমেরিকার বিশেষজ্ঞ বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী এই জটিল টানেল উদ্ধার অভিযানে সরাসরি হাত মিলিয়েছে। নেপালের জাতীয় জরুরি অপারেশন কেন্দ্র জানিয়েছে, আশার আলো কমলেও একটি প্রাণের সন্ধানেও তল্লাশি দলগুলি দিনরাত দুর্গম পাহাড়ের খাঁদে কাজ করে যাচ্ছে। এদিকে সীমান্তের ওপারে তিব্বত অঞ্চলেও বিপর্যয় আছড়ে পড়েছে। চিনা সরকারি হিসেবে সেখানে ১৬ জনের মৃত্যু এবং ৫৪৬ জন নিখোঁজের খবর নিশ্চিত করা হয়েছে।
নিখোঁজদের মধ্যে ১০৪ জন ভারতীয় নাগরিক রয়েছেন, যাঁদের সিংহভাগই পবিত্র কৈলাস-মানসরোবর তীর্থযাত্রায় গিয়েছিলেন; এছাড়াও রয়েছেন ৪৯ জন নেপালি এবং ৩৩ জন লাটভিয়ার পর্যটক। বুধবার চিন অবশেষে নেপাল সীমান্তবর্তী জিরং এলাকার একমাত্র ধসে পড়া রাস্তাটি সম্পূর্ণ খুলে দেওয়ায় ভারী উদ্ধারকারী যন্ত্রপাতি ও ক্রেন দুর্যোগের মূল কেন্দ্রে পৌঁছতে পেরেছে। রক্তচক্ষু আবহাওয়া ও দুর্গম খাদ সত্ত্বেও ড্রোন, লাইফ-ডিটেক্টর ও স্নিফার ডগ নিয়ে ধ্বংসস্তূপে চিরুনি তল্লাশি শুরু করেছে চিনের সেনাদল। নেপালের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। পশুপতিনাথ মন্দিরে নিখোঁজ পরিজনদের কুশ ঘাসের প্রতিকৃতি বানিয়ে প্রতীকী শ্রাদ্ধানুষ্ঠান সারছেন স্বজনহারারা।
সেভ দ্য চিলড্রেন জানিয়েছে, বন্ধুদের চোখের সামনে স্কুলবাস-সহ ভেসে যেতে দেখে কিংবা ঘরবাড়ি নদীগর্ভে তলিয়ে যাওয়ার দৃশ্য চাক্ষুষ করে নুয়াকোট ও রসুয়া এলাকার বেঁচে যাওয়া শিশুরা গভীর মানসিক ট্রমার শিকার হয়েছে। সংসদে দাঁড়িয়ে নেপালের প্রধানমন্ত্রী বলেন, “মানব সভ্যতার ইতিহাসে এটি অন্যতম বড় প্রাকৃতিক বিপর্যয়।” তিনি জানান, সতর্কবার্তা পেয়েই মানুষকে বাঁচাতে গিয়ে একাধিক নিরাপত্তাকর্মীও হড়পা বানের তোড়ে নিখোঁজ হয়ে গিয়েছেন। ভারত সহ আন্তর্জাতিক মহলের সহায়তায় বেইলি ব্রিজ বসিয়ে যোগাযোগ পুনঃস্থাপন ও ত্রাণসামগ্রী বিলির কাজ যুদ্ধকালীন তৎপরতায় চালানো হচ্ছে।


