দলবদলের জল্পনায় সিলমোহর দিয়ে অবশেষে নতুন রাজনৈতিক ইনিংসে পা রাখলেন কৃষ্ণনগরের বিদায়ী সাংসদ রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়। গত রবিবারই লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার উপস্থিতিতে তৃণমূল কংগ্রেসের একঝাঁক ‘বিদ্রোহী’ সাংসদ ঘাসফুল শিবির ছেড়ে যোগ দিয়েছিলেন সদ্যগঠিত ‘ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টি অফ ইন্ডিয়া’ বা এনসিপিআই (NCPI)-তে। রবিবাসরীয় সেই মেগা যোগদান পর্বে সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, কাকলি ঘোষ দস্তিদার থেকে শুরু করে দেব, ইউসুফ পাঠান কিংবা সায়নী ঘোষদের মতো হেভিওয়েটদের উপস্থিতি নজর কাড়লেও, অনুপস্থিত ছিলেন রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়। ব্যক্তিগত কারণে তিনি সেই সময় মালয়েশিয়ায় ছিলেন। তবে বুধবার দুপুরে মালয়েশিয়া থেকে সরাসরি দিল্লিতে পা রেখেই রাজনৈতিক তৎপরতা শুরু করে দিলেন টলিউডের ‘দিদি নম্বর ওয়ান’।
এদিন দুপুরে দিল্লি বিমানবন্দরে নেমেই রচনা বন্দ্যোপাধ্যায় সোজা চলে যান লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার কার্যালয়ে। সেখানে স্পিকারের সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ বৈঠক করেন তিনি। তবে স্পিকারের সঙ্গে দেখা করার আগে রাজনৈতিক মহলে জল্পনা বাড়িয়ে রচনা যান বিজেপি সাংসদ নিশিকান্ত দুবের বাসভবনে। সেখানে বেশ কিছুক্ষণ কথা বলেন দু’জনে। এরপর তিনি দেখা করেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদবের সঙ্গেও। নতুন রাজনৈতিক জোটে যোগ দেওয়ার আগে কেন্দ্রের এই দুই প্রভাবশালী নেতার সঙ্গে রচনার বৈঠক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
স্পিকারের ঘর থেকে সই-সাবুদ সেরে বেরিয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে রচনা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেন। তিনি বলেন, ‘‘আমি এখানে এসেছি এনসিপিআই-তে যোগদানের যাবতীয় কাগজপত্র সই করতে। রবিবারের অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে পারিনি, তাই আজই আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করলাম।’’
কয়েক দিন আগেই তৃণমূলের একদা ‘বিদ্রোহী’ সাংসদ এবং বর্তমানে এনসিপিআই সদস্য শতাব্দী রায় সংবাদমাধ্যমে জানিয়েছিলেন, রাজনৈতিক ভাবে দলবদলের সিদ্ধান্ত সঠিক হলেও তিনি ব্যক্তিগত স্তরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ভীষণ ‘মিস’ করেন। এদিন প্রায় একই সুর শোনা গেল রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গলাতেও। প্রাক্তন দলনেত্রী তথা তৃণমূল সুপ্রিমো সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে রচনা বলেন, ‘‘আমরা কখনও দিদির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে পারি না। তাঁর প্রতি আমার সর্বদা শ্রদ্ধা থাকবে এবং তা চিরকাল অটুট থাকবে। আমরা দিদির মুখ দেখেই ভোট পেয়েছিলাম, তাঁকে আমরা অত্যন্ত সম্মান করি।’’
তবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা প্রকাশ করলেও, দল ছাড়ার পেছনে রাজ্যের ‘উন্নয়ন থমকে যাওয়া’র তত্ত্বকেই ঢাল করেছেন রচনা। কৃষ্ণনগরের বিদায়ী সাংসদের দাবি, ‘‘দিদি দলের প্রধান মুখ ছিলেন ঠিকই, তবে আমি ভোট পেয়েছিলাম আমার কেন্দ্রের মানুষের জন্য কাজ করার উদ্দেশ্যে। সাধারণ মানুষের জন্য কাজ করতে গিয়ে দিদির সঙ্গে থাকাকালীন আমরা বারবার অনুভব করেছি যে, নানা বাধার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। যে উন্নয়নমূলক কাজগুলি করতে চেয়েছিলাম, তা করা যাচ্ছিল না।’’
রাজ্যে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পক্ষে সওয়াল করে রচনা আরও বলেন, ‘‘আমার মনে হয়, রাজ্য ও কেন্দ্রে একই দলের সরকার থাকলে উন্নয়নের কাজ করা অনেক বেশি সহজ হয়। দুর্ভাগ্যবশত, গত ১৫ বছরে পশ্চিমবঙ্গ সেই পরিস্থিতি দেখেনি। যার ফলে রাজ্যের সাধারণ মানুষ কেন্দ্রীয় প্রকল্পের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।’’
বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক সমীকরণ আমূল বদলে গিয়েছে। তৃণমূলের ভাঙনের পর রাজ্যের প্রশাসনিক রাশ এখন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর হাতে। সেই প্রসঙ্গ টেনে রচনা বন্দ্যোপাধ্যায় বর্তমান রাজ্য সরকারের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, ‘‘এখন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে আমরা দেখছি পশ্চিমবঙ্গে কত দ্রুত গতিতে উন্নয়নের কাজ এগিয়ে চলেছে। স্তব্ধ হয়ে যাওয়া প্রকল্পগুলো ফের সচল হচ্ছে। এই কর্মযজ্ঞের শরিক হতেই আমার এই সিদ্ধান্ত।’’ রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রচনার এই দলবদল তৃণমূলের অন্দরে যে বড়সড় ফাটল ধরেছে, তা আরও একবার প্রমাণ করল। এখন দেখার, দিল্লির এই পালাবদলের পর কৃষ্ণনগর তথা রাজ্য রাজনীতিতে রচনার আগামী ভূমিকা কেমন হয়।


