চৈত্র-বৈশাখের তপ্ত দুপুরে ঝাড়গ্রামের জঙ্গলমহলে এখন কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে রাজনীতির আলাপ। প্রথম দফার ভোট মিটে যাওয়ার পর অরণ্যশহর ঝাড়গ্রাম ও সংলগ্ন নয়াগ্রাম, গোপীবল্লভপুর বা বেলপাহাড়ির গ্রামগুলোতে এখন এক অন্য ছবি। ঘরছাড়া যে মানুষগুলো কাজের সন্ধানে মুম্বাই, চেন্নাই বা কেরলের মতো দূর-দূরান্তের রাজ্যে পাড়ি দিয়েছিলেন, তাঁদের অনেকেই এবার ঘরের টানে ফিরে এসেছেন কেবল একটা ভোট দিতে। কিন্তু ভোট মিটতেই সেই চিরকালীন টানাপোড়েন— রুজির টানে ফেরা নাকি ফলের অপেক্ষায় থেকে যাওয়া?
নয়াগ্রাম ব্লকের খাড়িকামাথানির বাসিন্দা গোকুল মাহাতো কাজ করেন পুণের এক নির্মাণ সংস্থায়। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে ট্রেনের টিকিট কেটে গ্রামে ফিরেছিলেন ২৩ এপ্রিলের ভোট দিতে। ভোট মিটেছে ঠিকই, কিন্তু গোকুল এখনই পুণে ফেরার নাম নিচ্ছেন না। তাঁর কথায়, ‘ভোটার তালিকায় নাম কাটা যাওয়ার যে ভয় ছিল, তাতে ভোট দেওয়াটা এবার জরুরি ছিল। এত বছর পর গ্রামে পরিবর্তনের একটা হাওয়া দেখছি, ৪ মে ফলটা না দেখে গেলে মনটা খচখচ করবে। অনেক দিন পর বাড়ির লোকেদের সঙ্গে মহুল বা শালপাতার জঙ্গলে ঘুরছি, কয়েক দিন কামাই হলেও ফলের দিনের সেই উত্তেজনাটা সচক্ষে দেখতে চাই।’ গোকুলের মতো জঙ্গলমহলের অনেক পরিযায়ী শ্রমিকই এখন ৪ মে পর্যন্ত নিজেদের ঘরমুখী যাত্রাকে স্থগিত রেখেছেন। তবে অভাবের তাড়না যাঁদের বেশি, তাঁদের কাছে ৪ মে-র টিভির পর্দা বা মোড়ের আড্ডার চেয়ে কর্মস্থলের হাজিরাই বেশি দামী।
বেলপাহাড়ির রঞ্জন মুর্মু কাজ করেন হায়দ্রাবাদে। ভোট দেওয়ার পরের দিনই তিনি ব্যাগ গুছিয়ে নিয়েছেন ফেরার জন্য। রঞ্জনের বক্তব্য, ‘ভোট তো দিলাম, কিন্তু বসে থাকলে তো হাঁড়ি চড়বে না। ৪ তারিখের খবর মোবাইলেই দেখে নেব। ওদিকে কাজে দেরি করলে ঠিকাদার আর নেবে না।’ জঙ্গলমহলের এই পরিযায়ী শ্রমিকদের অনেকেই আবার ‘এসআইআর’ বা ভোটার তালিকা সংশোধনের আতঙ্কে এবার বেশি সংখ্যায় গ্রামে ফিরেছিলেন। তাঁদের কাছে ভোট দেওয়া মানে কেবল পছন্দের দল বেছে নেওয়া নয়, বরং নিজের ভিটেমাটির ওপর অধিকারের শেষ সিলমোহরটি বজায় রাখা। ঝাড়গ্রামের এই গ্রামগুলোতে এখন আলোচনার কেন্দ্রে সেই একটাই প্রশ্ন— ৪ মে শেষ হাসি কে হাসবে? আর সেই হাসির সাক্ষী হতে কতজন শেষ পর্যন্ত জঙ্গলমহলের লাল মাটিতে থেকে যান, সেটাই এখন দেখার।


